সংকট মোকাবিলায় দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির সংকট দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এ অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক এবং দক্ষিণ-এশীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এই সংকটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেখানে ন্যায়ভিত্তিক ও বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর অপরিহার্য।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত ‘ইকোনমিক অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটি কমপ্লিকেশন অব কনফ্লিক্ট ইন ওয়েস্ট এশিয়া ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে এ মতামত উঠে আসে। ওয়েবিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিডা)।
বেলার পক্ষ থেকে বারীশ হাসান চৌধুরী সঞ্চালিত এই ওয়েবিনারে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিদ্যুত-জ্বালানি, পরিবেশ, আইন ও অর্থনীতি খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এ সময়ে তারা জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত সংস্কার এবং টেকসই রূপান্তরের পথ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
ওয়েবিনারে বাংলাদেশের কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত সেচব্যবস্থার বিস্তার, তৈরি পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাড়তি ব্যবহার এবং নেপালে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে কম শুল্কের মতো ইতিবাচক উদ্যোগগুলো তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবেশ সহজ করতে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা মার্চেন্ট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট এবং বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়।
তবে বক্তারা সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, গ্রিড উন্নয়ন ও শক্তি সঞ্চয় বিনিয়োগে ধীরগতি, নীতিনির্ধারণে স্বাধীন কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সীমিত অংশগ্রহণ, জীবাশ্ম জ্বালানি-প্রধান ট্যারিফ কাঠামো এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা, এসব চ্যালেঞ্জ এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।
ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকট কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আমদানি-নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলো ক্রমশ বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার ঝুঁকিতে পড়ছে। ঋণের বাড়তি চাপ, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক নীতিমালা এই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
বেলা থেকে অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী আইন ও নীতিমালা অপরিহার্য, যেখানে পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ওয়েবিনারে পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরা হয়, যেখানে ভোক্তানির্ভর সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। ইন্দুস কনসোর্টিয়ামের হুসেইন জারওয়ার বলেন, এই বিকেন্দ্রীভূত উদ্যোগ জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়েছে এবং আর্থিক বোঝা হ্রাস করেছে, তবে অব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি কেন্দ্রের জন্য উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পারি, ভোক্তানির্ভর নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারে। এ ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালাও দ্রুত হালনাগাদ করতে হবে।
সমাপনী বক্তব্যে ইটিআই বাংলাদেশের মুনির উদ্দিন শামীম এবং বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরামের সাজেদুল হক বলেন, জ্বালানি রূপান্তরকে আলাদাভাবে দেখা যাবে না। কার্যকর ফল পেতে হলে পরিবহনব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে।
ওয়েবিনারের শেষে দক্ষিণ এশিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি স্থিতিশীলতা জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানানো হয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এ আহ্বানে পূর্ণ সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।











